বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র বিশ বছরের মাথায় চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধীরা যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন সে সময় তার প্রতিবাদ করার জন্য কেউ-কেউ একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হবার পর ১৯৮১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আজম পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর তার নানা ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।
শেষ পর্যন্ত খোলস ছাড়িয়ে ১৯৯১ সালে গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচন করা হয়। তার আগেই জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে।
তখনই দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারি আম্মা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বরুপ উন্মোচনের জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
২৫ বছর আগে যখন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করা হয়েছিল তখন রাজনৈতিক সমর্থন চেয়েছিল সংগঠনটি। কারণ তারা বুঝতে পারছিলেন যে রাজনৈতিক সমর্থন না থাকলে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি'র সাথে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক মিত্রতা থাকায় বিএনপি এগিয়ে আসেনি। বরং নির্মূল কমিটির নেতাদের জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা এবং হয়রানি তৈরি করেছে।
অধ্যাপক মুনতাসির মামুন মনে করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থন না থাকলে তাদের আন্দোলন এগুতেই পারত না ।
অধ্যাপক মামুন বলছিলেন, "রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কোন আন্দোলন সফল হতে পারে না । জাহানারা ইমামের আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা যদি পাশে না দাঁড়াতেন, তহালে গণ আন্দোলন বা গণবিচার করা সম্ভব হতো না।"
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতারা বলছেন তাদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও হয়েছে।
- সংগঠনটির অনেক নেতা মনে করেন, তাদের দিক থেকে চাপ অব্যাহত ছিল বলেই ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এ সংগঠনটির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় সরকারের রোষানলেও পড়েছেন। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের সময়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল কমিটির বিরোধীতাকারীরা এমন অভিযোগও তুলেছে যে সংগঠনটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কাজ করছে।
শাহরিয়ার কবির মনে করেন তাদের আন্দোলনকে থামিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে আনা হয়েছিল।
মি: কবির বলছিলেন, "বামপন্থীরা বলে আমরা আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে গেছি। আবার আওয়ামী লীগ বলে আমরা বামদের কথা বলি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দাঁড়িয়ে আছি। সেখানে কারও সাথে আমাদের কখনো মিলেছে, আবার কখনো মিলেনি। কিন্তু আমরা এগিয়ে চলেছি।"
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতি শুরুর দিকে শহরাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ব্যাপক সমর্থন ছিল। ১৯৯৪ সালে এক প্রতীকী বিচারের মাধ্যমে গোলাম আজমের ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। যেটিকে তারা 'গণ আদালত' বলে বর্ণনা করেন।
এর ২০ বছর পরে এসে গোলাম আজমসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হয়। এ ২০ বছর বিচারের দাবীতে সক্রিয় ছিল সংগঠনটি। তারা বলছে যে দু'টো লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল তার মধ্যে একটি লক্ষ্য - অর্থাৎ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে।
কিন্তু এখনো পুরো লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে উল্লেখ করছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি অধ্যাপক মুনতাসির মামুন।
তিনি বলেন, "যারা ঘাতক তাদের কাছ থেকে উদ্ভূত হয়েছে মৌলবাদী রাজনীতির। এখন আমাদের আন্দোলন হচ্ছে বিচার চালিয়ে যাওয়া এবং একই সাথে জঙ্গি-মৌলবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন এখন বাংলাদেশে মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।"
গোলাম আজমের রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রতিবাদ জানাতেই গড়ে উঠেছিল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সংগঠনটির বর্তমান নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জড়িত ছিলেন।
মি: কবির বলছিলেন, " ১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর যেদিন আমরা কাগজে দেখলাম, একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এবং তখনো পাকিস্তানের নাগরিক গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের আমীর ঘোষণা করেছে। তখনই মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান আমাকে টেলিফোন করে বললেন যে এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদ করা দরকার।"
