পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় দার্জিলিং পাহাড়ে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট নেওয়া হবে ১৭ই এপ্রিল।
শাসনভার গ্রহণ করার কিছুদিনের মধ্যেই পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনরত দলটির সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী।
নতুন ভাবে তৈরি হয়েছে স্বশাসিত প্রশাসন ব্যবস্থা। তারপর থেকেই মমতা ব্যানার্জী দাবি করে থাকেন যে পাহাড়ে এখন শান্তি এসেছে, উন্নয়ন হচ্ছে।
জিটিএ-র প্রধান বিমল গুরুং বলছিলেন নিয়মিতভাবে তাঁদের প্রশাসনের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন আবার চুক্তির শর্তগুলো মানছেন না পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
“মা মাটি মানুষের কথা বলে যখন মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন পাহাড়ের মানুষও বিশ্বাস করেছিল তাঁকে যে তাদের অধিকারের আন্দোলন হোক বা উন্নয়নের প্রশ্ন হোক মমতা ব্যানার্জীকে পাশে পাওয়া যাবে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী যা যা দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো তো দেনই নি, উল্টে নিয়মিতভাবে স্বশাসিত প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করেছেন।”
জিটিএ-র কাজে হস্তক্ষেপ যদি গোর্খা নেতাদের একটা অভিযোগ হয়, তাহলে আরও সম্প্রতি নেওয়া পাহাড় সংক্রান্ত একটা সরকারি সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকার আর গোর্খা স্বশাসিত প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলেছে।
পাহাড়ের বাসিন্দা বিভিন্ন ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলির উন্নয়নের জন্য আলাদা আলাদা বোর্ড তৈরি করেছে রাজ্য সরকার। এতদিন গোর্খাল্যান্ড প্রশাসনের হাতে যে উন্নয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল, তা সরাসরি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছিয়ে দিতে শুরু করেছে এই সরকারি বোর্ডগুলি।
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা আর জিটিএ- দুইয়েরই প্রধান বিমল গুরুং জনজাতিগুলির জন্য এই পৃথক বোর্ড গঠনের প্রচেষ্টাকে মমতা ব্যানার্জীর ডিভাইড এন্ড রুল অর্থাৎ বিভেদ আর শাসন পদ্ধতি বলে উল্লেখ করেন।
পৃথক উন্নয়ন বোর্ড পেয়েছে, এরকমই একটি জনজাতি মঙর। এদের সংগঠন মঙর সংঘ, ভারতের সহকারী সম্পাদক মনীশ রাণা মঙ্গর বলছিলেন, “জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, তাদের মধ্যে যাতে ঠোকাঠুকি লাগে। বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই এটা করা হয়েছে।“
পাহাড়ের আরেকটি বড় জাতিগোষ্ঠী বৌদ্ধ তামাংরা। তাদের সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি পাসাং তামাং ও অনেকটা একই কথা বলছিলেন।
কিন্তু তিনি বলছেন গোর্খাল্যান্ডের দাবি তুলতে গিয়ে তো জনজাতিগুলো বা সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়ে থাকছেন। এই পৃথক বোর্ড, যেটা মমতা ব্যানার্জী দিয়েছেন শেরপাদের, এটা শুধু উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটা শেরপাদের একটা আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে।
মোট সাতটি জনজাতির জন্য পৃথক উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করেছে সরকার। তার অন্যতম হল পশ্চিমবঙ্গ ভূটিয়া উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটির চেয়ারম্যান পালডেন ভূটিয়া বলছিলেন, “সরকার তো গোটা ভূটিয়া সম্প্রদায়ের জন্য বোর্ড তৈরি করেছে, কেন এটাকে বিভেদ বলা হচ্ছে? যখন নেতাদের মাধ্যমে টাকা আসত, অন্যান্য সুযোগসুবিধা আসত আর সেটা তারা নিজেদের কাছের লোকেদের মধ্যে বিলি করতেন, কই তখন তো বিভেদের রাজনীতির কথা তোলেন নি কেউ। এখন বোর্ড গড়ে সত্যিকারের গরীব মানুষের কাছে সরাসরি সাহায্য পৌঁছচ্ছে বলে বিভেদ মনে হচ্ছে নেতাদের?”
কালিম্পংয়ের বিদায়ী বিধায়ক, দীর্ঘদিনের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা নেতা হরকা বাহাদুর ছেত্রী অতি সম্প্রতি মোর্চা থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি করেছেন নিজের দল জন আন্দোলন পার্টি। মি. ছেত্রীও বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গোর্খাল্যান্ডের নাম করে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো ভুলিয়ে রেখেছেন এক শ্রেণীর গোর্খা নেতা।
“পাহাড়ের সব জনজাতি তো একসঙ্গেই ছিল। কিন্তু টাকা পয়সা দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। একটা সময় আসবে যখন সম্মিলিতভাবে গোর্খারা হয়ত সংখ্যালঘু হয়ে যাবে , তাহলেই আর আলাদা গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবি তুলতে পারবে না কেউ।“a
কিন্তু জনজাতিগুলির যে অংশকে সরকারি উন্নয়ন বোর্ডগুলিতে যুক্ত করা হয়েছে, বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা বলছেন, গোর্খাল্যান্ডের দাবি তোলা হচ্ছে ১০৭ বছর ধরে। সেই দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে তো বর্তমান সময়ে জনজাতিগুলির উন্নয়ন হচ্ছে না, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো মিটছে না।
শেরপা জনজাতিদের জন্য তৈরি সরকারি সংস্থা শেরপা সাংস্কৃতিক বোর্ডের আহ্বায়ক নিমা শেরিং শেরপা বলছেন, “গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিটা আসলে একটা রূপকথার গল্পের মতো। ওটা আমাদের কাছে একটা ভাবাবেগ। ওই দাবির সঙ্গে আমরা আগেও ছিলাম, পরেও থাকব।“
কিন্তু রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের বিদায়ী মন্ত্রী গৌতম দেবের কথায়, “জনজাতিগুলোর জন্য যদি ওয়েলফেয়ার বোর্ড করা হয় তাহলে বিমল গুরুংয়ের অসুবিধা কোথায়? তাদের চিরাচরিত সংস্কৃতি, ভাষা রক্ষায় যদি এই বোর্ডগুলো কাজ করে, জনজাতিগুলোর গরীব মানুষদের জন্য বাড়ি তৈরির টাকা দেয়, তাহলে কার কী ক্ষতি হবে? আসলে বিমল গুরুংকে এইসব কথা বলতে হচ্ছে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্য।“
পাহাড়ের জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে যে ডিভাইড এন্ড রুলের রাজনীতি করছেন মমতা ব্যানার্জী, সেই অভিযোগ উঠছে ওই জনজাতিগুলির মধ্যে থেকেও।
বিমল গুরুং বলছেন ৫৬টা দপ্তর গোর্খা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল – মাত্র দু-তিনটে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জ্জী এবং এখন দেখা যাচ্ছে, বাংলায় তিনি যেরকম একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছেন, এখানেও সেরকম চাপ তৈরি করছেন।
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার পরের কয়েক বছর রাজ্য সরকার আর স্বশাসিত গোর্খাল্যান্ড ক্ষেত্রীয় প্রশাসন বা জিটিএর মধ্যে একটা সুসম্পর্কই ছিল। গোর্খা নেতা বিমল গুরুংকে পাশে বসিয়ে অনেক প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক সভাই করেছেন মিজ. ব্যানার্জী।কিন্তু বছর দুয়েক আগে থেকে শুরু হয় সম্পর্কের অবনতি।
